4:08 pm - Saturday October 25, 2014

আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্‌ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর জীবনালেখ্য [প্রথম পর্ব]

গাউছে জামান সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মাজার শরীফ

গাউছে জামান সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মাজার শরীফ

আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৩৩৬ হিজরী অনুসারে ১৯১৬ সালে   বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে হাজারা জিলার সিরিকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত অলি-ই কামিল কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির দ্বিতীয় পুত্র। বংশ পরম্পরায় তিনি ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ৩৭তম বংশধর।  তিনি পিতৃকুল-মাতৃকুল দিক দিয়ে ছিলেন সৈয়্যদ বংশীয়। তাঁর শিরা-উপশিরায় সঞ্চালিত বংশ পরম্পরায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পূতঃপবিত্র রক্তধারা ও পুরুষানুক্রমে লব্ধ মহাসাধকের শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সোপান অতিক্রমে সক্ষম হন। তাঁর  জন্মের পূর্বে ও শৈশবে সংঘটিত ঘটনাসমূহ দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হয়। সে সব ঘটনা হতে কয়েকটি উদ্ধৃত করা হল :

 

  • ১. একদা আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর পীর খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির খিদমতে উপস্থিত হন, তখন খাজা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি নিজের পৃষ্ঠদেশে আল্লামা সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির শাহাদাত আঙ্গুলি রেখে ঘর্ষণ করে বলেন- ‘يه پاك چيزتم لے  لو “এ পবিত্র বস্তু তুমি নিয়ে নাও” যেমনটি গাউসুল আযম শায়খ আবদুল ক্বাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এরূপে শায়খ আলী ইবন মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির পৃষ্ঠদেশ ঘর্ষণ করে সন্তান দান করেছিলেন। পরে ঐ সন্তান ইবনুল আরবী নামে খ্যাতি লাভ করেন।

 

  • ২. আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির জন্মের ৬/৭ মাস পর খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সিরিকোটে আগমন করেন। তখন তাঁকে শিরণী খাওয়ানোর সময় খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বললেন,  طيب تم نهيں كهاتے تم هم بهى نهيں كهائنگے  তৈয়্যব তুমি না খেলে আমরাও খাব না এ কথা শুনে তিনি শিরণী খেতে লাগলেন

 

  • ৩. আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির বয়স যখন প্রায় দু’বছর, তখন তাঁর আম্মাজান তাঁকে নিয়ে খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির খিদমতে উপস্থিত হন। সেখানে অবস্থানকালে খাজা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির সম্মুখে তিনি শিশুসূলভ অভ্যাসে মায়ের দুধপান করতে চাইলেন। তখন খাজা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বললেন,تم بڑهاهوگيا دوده مت پيو  তুমি বড় হয়েছ, দুধপান কর না। পরে তিনি আর মায়ের দুধ পান করেননি। শত চেষ্টা করেও তাঁকে আর দুধ পান করানো সম্ভব হয়নি।

 

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন মূলত: আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রতি তাঁর পীর খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির আল্লাহ্ প্রদত্ত উপহার। কেননা তখন আল্লামা সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির বয়স ছিল প্রায় ৬০ বছর। সাধারণত বৃদ্ধ বয়সের সন্তান দুর্বল হয় এবং বংশ পরম্পরা দীর্ঘ হয় না। তাই তা খণ্ডন পূর্বক আল্লামা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি “পাক চীজ”  উল্লেখ করে পুত্র ও নাতি উভয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। কারণ পাক শব্দের আরবী প্রতিশব্দ  “তৈয়ব ও তাহের” যেমনটি আল্লাহ্ ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর নিকট ইসহাক আলায়হিস্ সালামকে দান করার ক্ষেত্রে ইয়াকুব আলায়হিস্ সালাম-এর কথা উল্লেখ করেছেন।

 

১৯১২ সালে পীরের দরবারে আসার পর হতে তাঁর উপর সদা পীর-মুরশিদের সদয়দৃষ্টি বিরাজমান ছিল বিধায় মাত্র চার বছরে আল্লামা সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় পীরের দরবার হতে প্রাপ্ত হন এমন এক পবিত্র সন্তান, যিনি জন্ম থেকেই আধ্যাত্মিক চর্চায় তৎপর এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের অনুগত।প্রয়োজন ও চাওয়ার আগে প্রাপ্ত দান বরকতপূর্ণ, পূতঃপবিত্র এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান-গরিমায় পরিপূর্ণ হবেন, তা উপরিউক্ত কর্ম দ্বারা সুস্পষ্ট। অধিকন্তু আল্লামা চৌহরভীর রাহমাতুল্লাহি আলায়হির তাওয়াজ্জুতে আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বড় হন। এছাড়াও আয়াতের আলোকে বলা যায় আল্লাহ্ তাআলার প্রদত্ত এ ধরনের বংশধরগণ হয়ে থাকেন জন্মগতভাবে হিদায়তপ্রাপ্ত, সৎকর্মশীল, মর্যাদাবান এবং হিদায়তকারী। তাই শৈশব কাল থেকেই আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মাঝে সুপ্ত আধ্যাত্মিক প্রতিভা বিকশিত হয়ে আসছিল। তিনি শৈশবে পিতার সান্নিধ্য লাভ করেছেন মাত্র চার বছর বয়স পর্যন্ত; কিন্তু ইতিমধ্যে পিতার নিকট আরজ করে বসলেন,نماز ميں اپ الله كو ديكهتے هيں مجهے ديكهنا هے  নামাযে আপনি আল্লাহকে দেখেন, আমারও আল্লাহকে দেখা চাই১০

 

আরো উল্লেখ আছে যে, আল্লামা সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় পীরের নির্দেশে ১৯২০ সালে বার্মায় গমনের আগে কোন এক সময় সপরিবারে আজমীর শরীফ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করেন। সেখানে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মাযার চত্বরে শিশু তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আপন মনে ঘুরাফেরা করতে থাকেন; তখন হঠাৎ এক নূরানী লোক এসে তাঁকে পাশে বসায়ে কিছু দুআ পড়লেন-পড়ালেন, ঐ সময় আল্লামা সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এক খাদিমের ঘরে অবস্থান করছিলেন। পরে তিনি জানতে পেরে বললেন, بيٹها وه تو خواجه تهے   বৎস! উনি তো খাজা ছিলেন১১

 

বস্তুত এ সবই ছিল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই এভাবে শৈশব হতে তাঁর থেকে অলিত্ব ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ হতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন মহানবীর নূরের আলোকচ্ছটা, আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির আর্শীবাদ, মাতৃগর্ভজাত অলি এবং পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি পিতার নিকট হতে গ্রহণ করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।১২ তবে তিনি স্থানীয় উস্তাদের নিকট মাত্র ১১ বছর বয়সে কুরআন মজিদ হিফয সমাপ্ত করেন।১৩  কুরআন মজিদ হিফয করার সময় সংঘটিত একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।ঘটনাটি এই- একদা আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র সম্মানিত শিক্ষক স্বপ্নযোগে প্রিয়নবী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার সাক্ষাত লাভে ধন্য হন। ঐ সময় প্রিয়নবী উক্ত শিক্ষককে খবর প্রদান করেন যে, ছাত্রদের মধ্যে তাঁর একজন বংশধর আছেন, যেন তাঁর যত্ন নেয়। অতঃপর উক্ত শিক্ষকের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন, কে সেই ? তাই দেরী না করে পরীক্ষা করলেন এভাবে – তিনি প্রত্যেক ছাত্রকে একটি করে কমলা দিয়ে বললেন, যাও! তোমাদের হাতের কমলা এমনভাবে খাও, যাতে আল্লাহ তাআলা না দেখেন। শিক্ষকের নির্দেশ পেয়ে প্রত্যেক শিশু নিজ নিজ মত করে কমলা খেয়ে আসল; কিন্তু শিশু তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি কমলাটি উক্ত শিক্ষককে ফেরত দিয়ে বললেন  “আল্লাহ হার জাগা মে হ্যায়” আল্লাহ প্রত্যেক জায়গায় আছেন১৪ এ কথা শুনে শিক্ষক মহোদয় আওলাদ-ই রাসূলের পরিচয় পেয়ে গেলেন।

 

।।> আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্‌ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর জীবনালেখ্য [শেষ পর্ব] পড়তে ক্লিক করুন এখানে

 

————————————————————-

১. এ বর্ণনাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তবে বর্তমানে কেউ কেউ নির্ভরযোগ্য তথ্য সূত্রে মত ব্যক্ত করেন যে, ১৯১৬ সালের পরবর্তী কোন একসময়ে আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.) জন্ম গ্রহণ করেন।

২. ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদ, আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.) : ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান (কুষ্টিয়া : ইসলামিক ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ-১৯৯৯ইং), খন্ড : ০৮, সংখ্যা :০১,  পৃ.৯১।

৩. সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, মুর্শিদে বরহক আল্লামা হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি’র জীবনী গ্রন্থ, (চট্টগ্রাম : তাসলীমা একাডেমী-২০০৬ইং) পৃ.৪২।

৪. আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)’র র্পূবপুরুষদের নামের তালিকা অনুসারে দেখা যায় যে, তাঁর নাম ৪০তম এ আছে। ওখানে রাসূল (সা.) এর নামও ক্রমধারায় সর্বপ্রথম উল্লেখিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা.)’র বংশধর হিসেবে সর্বপ্রথম হযরত ফাতিমা (রা.)’র নাম আসবে। সে হিসেবে আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রা.)’র পিতার নাম ৩৮তম আর তাঁর নাম হবে ৩৯তম। এ ধারা মোতাবিক তিনি ইমাম হোসাইন (রা.)’র ৩৭তম বংশধর হন।

৫. মোছাহেব উদ্দীন বখতেয়ার, ইসলামের মহান সংস্কারক গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রাহমাতুল্লাহ আলাইহি) শীর্ষক সেমিনার (চট্টগ্রাম:আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া-১৯৯৮ইং)পৃ.০৪ ।

৬. এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্সী, গাউছুল আযম হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহ:) (ঢাকা : বাংলাদেশ তাজ কোম্পানী লিঃ  ১৯৯৯ইং) সংস্করণ : ০৮,পৃ. ১৩৯-১৪০।

৭. সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬।

৮.  মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী, তাফসীর-ই নাঈমী (লাহোর: মাকতাবা-ই  ইসলামিয়া-১৩৮৭ হি.) খণ্ড:৭ম, পৃ.৬৫৩।

৯.  আল-কুরআন, ৬:৮৬।

১০. সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ.৪৭।

১১.  প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮।

১২. মুহাম্মদ জানআফ মূসা যায়ী, তাযকিরা-ই পীর সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (পেশোয়ার:মাজলিস-ই গাউসিয়া সিরিকোটিয়া-১৯৯৩ ইং) পৃ. ০৭।

১৩. সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ.৪৯।

১৪. মাওলানা নূরুল ইসলাম, (প্রাক্তন ছাত্র- জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া, চট্টগ্রাম; স্বত্তাধিকারী,-নূর এন্ড সন্স, জলসা মার্কেট,চট্টগ্রাম) এক সাক্ষাতকালে এ ঘটনা বর্ণনা দেন।

 

ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম

শিক্ষক,লেখক ও গবেষক।

www.rawshandalil.com

Filed in: আউলিয়ায়ে কিরাম

No comments yet.

Leave a Reply